যায়যায়বেলা
যায়যায়বেলা

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৫৬৭ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ,৩০ কোটি টাকার লিচু বিক্রির আশা

মাইন উদ্দিন চিশতী

ফলের রাজ্য হিসেবে পরিচিত সীমান্ত ঘেষা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলা। এই উপজেলায় রয়েছে লিচু, কাঁঠাল, মাল্টা, পেয়ারাসহ বিভিন্ন ফলের বাগান এ বছর লিচুর ভালো ফলন হয়েছে।আবহাওয়া অনুকলে থাকায় লিচুর ভালো ফলন হয়। গত ১৫ দিন ধরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাজারগুলোতে পুরোদমে বিক্রি হচ্ছে এই লিচু।দাম হাতের নাগালের মধ্যে থাকায় খুশী বাগান মালিক ও ক্রেতারা।এদিকে লিচু পাকতে শুরু করায় ও বাগানগুলোর ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ায় প্রতিদিনই দূর-দূরান্ত থেকে উৎসুক মানুষ গিয়ে লিচু বাগানে ভীড় করছেন।লিচু বাগানে তারা প্রিয়জনদের সাথে সেলফি তুলছেন।ফেরার সময় কিনে নিয়ে আসছেন লিচু।কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর,ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে,চলতি বছর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় মোট ৫৬৭ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ করা হয়েছে।এর মধ্যে বিজয়নগর উপজেলায় ৪২৫ হেক্টর,আখাউড়া উপজেলায় ৮০ হেক্টর,কসবা উপজেলায় ৪০ হেক্টর,নবীনগর উপজেলায় ১৫ হেক্টর, নাসিরনগর উপজেলায় ৩ হেক্টর, সদর উপজেলায় ১ হেক্টর, সরাইল উপজেলায় ১ হেক্টর, বাঞ্ছারামপুর উপজেলায় ১ হেক্টর ও আশুগঞ্জ উপজেলায় ১ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ করা হয়।সবচেয়ে বেশী আবাদ হয়েছে ভারতের ত্রিপুরা সীমান্তবর্তী বিজয়নগর উপজেলায়।বিজয়নগর উপজেলার লিচু মিষ্টি ও রসালো হওয়ায় দেশজুড়ে রয়েছে এই লিচুর আলাদা কদর।খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০২ সাল থেকে বিজয়নগর উপজেলায় বাণিজ্যিকভাবে লিচুর আবাদ করা শুরু হয়।কম পরিশ্রমে বেশী লাভ হওয়ায় এখানকার ধানি জমিগুলোকেও লিচু বাগানে পরিনত করতে থাকেন চাষীরা।বর্তমানে উপজেলার পাহাড়পুর, বিষ্ণুপুর, কাঞ্চনপুর, খাটিংগা, কাশিমপুর, সিঙ্গারবিল, চম্পকনগর, আদমপুর,কালাছড়া,মেরাশানী,সেজামুড়া,কামালমোড়া,নুরপুর,হরষপুর,মুকুন্দপুর,,অলিপুর,চান্দপুর,কাশিনগর,ছতুরপুর, রূপা,শান্তামোড়া,কামালপুর, কচুয়ামোড়া,ভিটিদাউপুর এলাকায় প্রায় তিন শতাধিক লিচুর বাগান রয়েছে।এসব বাগানে দেশী লিচু, এলাচি লিচু, চায়না লিচু, পাটনাই লিচু ও বোম্বাই লিচু চাষ করা হয়। উপজেলার প্রায় প্রত্যেকের বাড়িতেই একটি লিচু গাছ আছে। যাদের বাড়িতে একটু জায়গা আছে, তারা প্রত্যেকেই বাড়িতে অন্যান্য ফলের গাছের সাথে লিচু গাছ লাগান।স্থানীয় এলাকাবাসী ও চাষীরা জানান, লিচু গাছে মুকুল আসার পর থেকে কয়েক দফা বাগান বিক্রি হয়।গাছে মুকুল ও গুটি আসার পর প্রথমে বাগান কিনেন স্থানীয় ও বিভিন্ন জেলার মহাজনরা। গুটি একটু বড় হওয়ার পর দ্বিতীয় দফায় গাছ বিক্রি হয়। লিচু আকার ধারণ করলে তৃতীয় দফায় বিক্রি হয়। লিচু বড় হলে চতুর্থ দফায় বাগান বিক্রি হয়।বিজয়নগর উপজেলার সবচেয়ে বড় লিচুর বাজার হচ্ছে উপজেলার আউলিয়া বাজার। এছাড়াও উপজেলার মেরাশানী, মুকুন্দপুর, কাংকইরা বাজার, চম্পকনগর, সিঙ্গারবিল বাজার, আমতলী বাজারসহ আরো কয়েকটি বাজারে পাইকারীভাবে লিচু বেচা-কেনা হয়।প্রতিদিন ভোর রাত ৪টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত এসব বাজারে লিচু বিক্রি করা হয়। প্রতিদিন উপজেলার আউলিয়া বাজারসহ বিভিন্ন বাজারে প্রায় ২০/২৫ লাখ টাকার লিচু বেচা-কেনা হয়।এসব বাজার থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, নরসিংদী, ভৈরব, নোয়াখালী, চাদপুর, মৌলভীবাজার, সিলেট, শ্রীমঙ্গল, হবিগঞ্জ, ফেনী ও রাজধানী ঢাকার ব্যবসায়ীরা লিচু কিনে বিভিন্ন যানবাহনে করে নিয়ে যায়।উপজেলার বিষ্ণুপুর গ্রামের বাগান মালিক মাসুক মিয়া বলেন, এ বছর আবহাওয়া অনুক‚লে থাকায় লিচুর ফলন ভাল হয়েছে। সন্তুষ্টি প্রকাশ করে তিনি বলেন, তার বাগানে এবার যে লিচু ধরেছে তিনি এই লিচু প্রায় ৮ লাখ টাকা বিক্রি করতে পারবেন বলে আশা করছেন। তিনি বলেন, সরকার যদি আমাদের সহযোগিতা করে তাহলে আগামীতে আরো বেশি পরিমাণ জায়গায় তিনি লিচুর আবাদ করবেন।একই উপজেলার পাহাড়পুর ইউনিয়নের মো: সোহেল মিয়া নামে আরেক বাগান মালিক বলেন,বিগত বছর থেকে তিনি বাগানে বেশ পরিচর্যা করেছেন। এজন্য এবছর তার বাগারে লিচুর খুবই ভালো ফলন হয়েছে। তিনি বলেন, সরকারি সহযোগীতা পেলে বিজয়নগরে তার মতো অনেকেই লিচুর বাগান করতে এগিয়ে আসবে।আউলিয়া বাজার এলাকার লিচু বিক্রেতা মো.দুলাল মিয়া বলেন,আমরা বাগান থেকে প্রতি হাজার লিচু ২৩০০ টাকায় কিনে বাজারে নিয়ে ২৫০০ টাকা দরে বিক্রি করছি। এ বছর লিচুর ফলন ভালো হওয়ায় বাজারে লিচুর দাম কম। তাই ক্রেতারাও খুশী।আখাউড়া সড়ক বাজার এলাকার লিচু বিক্রেতা আসু মিয়া বলেন, প্রতিবছর তিনি বিজয়নগর থেকে লিচু কিনে আখাউড়ায় নিয়ে বিক্রি করছেন। তিনি বলেন, আমরা বাগান থেকে প্রতি হাজার লিচু ২৩০০ টাকায় কিনে আখাউড়ায় নিয়ে ২৫০০ টাকা দরে বিক্রি করছি। তিনি বলেন, এ বছর লিচুর ফলন ভালো হওয়ায় বাজারে লিচুর দাম কম। তাই ক্রেতারাও খুশী।কুমিল্লা জেলা থেকে লিচু কিনতে আসা ব্যবসায়ী জমির হোসেন জানান, বাজারে বিজয়নগরের লিচুর বিশেষ চাহিদা থাকায় আমি প্রতি বছরই এখান থেকে লিচু কিনে কুমিল্লায় নিয়ে পাইকারী বিক্রি করি। এখানকার লিচু মিষ্টি ও সু-স্বাদু হওয়ায় ক্রেতাদের কাছে এর চাহিদা বেশি। তিনি বলেন, এখান থেকে প্রতি হাজার লিচু ২৩০০ টাকায় কিনে কুমিল্লায় নিয়ে ২৫০০ থেকে ২৮০০ টাকায় বিক্রি করি।ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে লিচু কিনতে যাওয়া মোঃ আলী বলেন, আমরা বিজয়নগরের বিভিন্ন জায়গা থেকে লিচু কিনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে বিক্রি করি। এই এলাকার লিচু হিসেবে ঠিক পাওয়া যাওয়ায় ক্রেতারা খুবই খুশী হয়। তিনি বলেন, প্রথম প্রথম এখান থেকে লিচু কিনে শহরের নিয়ে প্রতি একশ লিচু ৩০০ টাকায় বিক্রি করি। এখন ভরা মৌসুমে এখান থেকে লিচু কিনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ২৫০০/২৬০০ টাকায় বিক্রি করি।ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে লিচু কিনতে যাওয়া এক যুবক বলেন, এই অঞ্চলের লিচু রসালো ও সু-স্বাদু। রাজশাহীর লিচু থেকেও এখানকার লিচু ভালো। অন্যান্য জায়গায় বিক্রেতারা লিচু হিসেবের চেয়ে কম দেয়। এখানকার লিচু হিসেবে কম দেয়া হয়না। তাই এখান থেকে লিচু কিনতে এসেছি।ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর থেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে বিজয়নগরে লিচুর বাগান দেখতে যাওয়া সোহেল রানা বলেন, ফেসবুকে দেখে পরিবার পরিজন নিয়ে বাগান দেখতে এসেছি।বাগান দেখে খুবই ভালো লেগেছে।শিপ্রা রায় নামে ভ্রমন পিয়াসু বলেন,আমার বাবার বাড়ি নারায়নগঞ্জে। আমার বিয়ে হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া।বিয়ের পর এখানে আমার প্রথম আসা।বাগান দেখে খুবই ভালো লেগেছে।বিজয়নগর উপজেলার পাহাড়পুর ইউনিয়ন পরিষদের ৭নং ওয়ার্ডের সদস্য মোঃ ফয়সাল আহম্মেদ বাছির বলেন,আমাদের এলাকার লিচুর গুণগত মান অনেক ভাল। সেজন্য এখানে বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন লিচু কিনতে আসে,বাগানে ঘুরতে আসে।মানুষ আমাদের এলাকার লিচু বাগান দেখতে আসায় আমরা খুবই আনন্দিত।এ ব্যাপারে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উপ-পরিচালক সুশান্ত সাহার সাথে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, মাটি ও আবহাওয়ার কথা চিন্তা করলে আমাদের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা লিচু চাষের জন্য খুবই উপযোগী। এর মধ্যে বিজয়নগর, কসবা ও আখাউড়া উপজেলায় অধিকাংশ লিচু বাগান রয়েছে। আমাদের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা লিচুর মৌসুম শুরু হওয়ার পর থেকে চাষীদের সব ধরনের সহযোগীতা ও পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন।তিনি বলেন, এবার আবহাওয়া ভালো থাকায় চলতি মৌসুমে ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চে কমপক্ষে ২৭৬৫ মেঃ টন লিচুর ফলন হবে।যার বাজার মূল্য আনুমানিক ৩০ কোটি টাকা।

 

যায়যায়বেলা